শনিবার, ০৭ মার্চ, ২০২৬

প্রীতিলতা: সাহসিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক

পাহাড়তলী ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণের পর প্রীতিলতা পূর্ব সিদ্ধান্ত মতো মুখে পটাসিয়াম সায়ানাইড পূর্ণ করেন। বিপ্লবীরা তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে দ্রুত স্থান ত্যাগ করেন। পরদিন পুলিশ ক্লাব থেকে ১০০ গজ দূরে প্রীতিলতার মরদেহ পাওয়া যায়।

১৯১১ সালের ৫ মে চট্টগ্রামের ধলঘাটে জন্ম নেন প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। পরিবারের সবাই আদর করে তাকে ডাকত ‘রাণী’ বলে। অন্তর্মুখী ও লাজুক স্বভাবের সেই ছোট্ট রাণীর শিক্ষা জীবনের শুরু ডা. খাস্তগীর উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে। সেখানেই ইতিহাসের শিক্ষকদের মাধ্যমে উদ্বুদ্ধ হন। ঝাঁসীর রাণী লক্ষীবাই-এর সাহসিকতা তার মনে গভীর ছাপ ফেলে। এরপর বন্ধু কল্পনা দত্তের সঙ্গে স্বপ্ন দেখা, পড়াশোনা, নাট্যচর্চা— সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সবকিছুই তাকে বিপ্লবের সঙ্গে প্রস্তুত করতে থাকে।

গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনের পর চট্টগ্রামের বিপ্লবীরা যখন সক্রিয় হচ্ছিল, সে সমতটাতে কেবলই কৈশরে পা রেখেছেন প্রীতিলতা। ১৯২৩ সালের ১৩ ডিসেম্বর টাইগার পাসে সূর্য সেনের দলের ছিনতাই ও পরবর্তীতে পুলিশের হানায় গ্রেফতার—এসব ঘটনা কিশোরী প্রীতিলতার মনে প্রশ্নের জন্ম দেয়। স্কুলের শিক্ষক ঊষাদির সঙ্গে আলাপে তিনি মামলার বিস্তারিত জানতে পারেন। সে সময়টায়েই লুকিয়ে লুকিয়ে ‘দেশের কথা’, ‘বাঘা যতীন’, ‘ক্ষুদিরাম’ পড়ে বিপ্লবের আদর্শে অনুপ্রাণিত হন। একপর্যায়ে দাদা পূর্ণেন্দু দস্তিদারের কাছে বিপ্লবী সংগঠনে যোগ দেয়ার ইচ্ছাও প্রকাশ করেন, যদিও তখনো মহিলা সদস্যদের দলে নেয়ার অনুমতি ছিল না।
ঢাকায় পড়াশোনার সময় ‘শ্রীসংঘ’-এর মহিলা শাখা ‘দীপালী সঙ্ঘ’-এ যোগ দেন প্রীতিলতা। লীলা নাগের নেতৃত্বে নারীশিক্ষা ও গোপনে বিপ্লবী কর্মকাণ্ড চালাতেন তারা। ইডেন কলেজের শিক্ষক নীলিমাদির মাধ্যমে পরিচয়, লাঠিখেলা, ছোরাখেলা প্রশিক্ষণ এবং বিপ্লবী আদর্শের দীক্ষা গ্রহণ করেন। ১৯২৯ সালে চট্টগ্রামে সূর্য সেন নারী সম্মেলন আয়োজনের অনুমতি দিলে প্রীতিলতা ও কল্পনা দত্ত সেখানে অংশ নেন, তবে বিপ্লবী দলে সরাসরি যুক্ত হতে পারেননি। ১৯৩০ সালের ১৯ এপ্রিল আইএ পরীক্ষা শেষে চট্টগ্রামে ফিরে ‘চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহ’-এর সংবাদ পান তিনি।

১৯৩২ সালে চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহের দুই বছর পেরিয়ে গিয়েছিল। মাস্টারদা সূর্য সেন ও নির্মল সেন গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছিলেন। ধলঘাটের সাবিত্রী দেবীর বাড়ি, যেটি বিপ্লবীদের কাছে মূলত ‘আশ্রম’ নামে পরিচিত, সেটি ছিল তাদের অন্যতম গোপন আস্তানা। ঝড়-ঝাপটা মাথায় নিয়ে ১২ জুন রাতে সেই আশ্রমে পৌঁছান প্রীতিলতা। ১৩ জুন সন্ধ্যায় পটিয়া পুলিশ ক্যাম্প অভিযান চালালে মাস্টারদা প্রীতিলতা ও অপূর্ব সেনকে সঙ্গে নিয়ে কচুরিপানা ভরা পুকুর ও জঙ্গলের মধ্য দিয়ে জৈষ্ট্যপুরার ‘কুটির’ গোপন আশ্রয়ে পৌঁছান। পরের দিন সূর্য সেন প্রীতিলতাকে বাড়ি পাঠিয়ে দেন।

ধলঘাট সংঘর্ষের পর সকালে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ সুপার ও সেনাধ্যক্ষ ঘটনাস্থলে এসে সাবিত্রী দেবী, তার ছেলে এবং আরো তিন যুবককে বিপ্লবীদের আশ্রয় দেয়ার দায়ে গ্রেফতার করেন। তাদের চার বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। এ সময় তাদের তল্লাশিতে প্রীতিলতা ও অন্যদের ছবি, চিঠি, বইয়ের পান্ডুলিপি উদ্ধার হয়। পুলিশের অনুসন্ধান শেষে ছাত্র পড়ানোর অজুহাত দেখিয়ে ৫ জুলাই মনিলাল দত্ত ও বীরেশ্বর রায়ের সহায়তায় আত্মগোপনে চলে যান প্রীতিলতা। কয়েকদিন চট্টগ্রামের গোপন আস্তানায় কাটিয়ে তিনি পড়ৈকড়া গ্রামের রমণী চক্রবর্তীর ‘কুন্তলা’ বাড়িতে আশ্রয় নেন, যেখানে মাস্টারদা ও তারকেশ্বর দস্তিদারও ছিলেন। ১৩ জুলাই ১৯৩২ আনন্দবাজারে খবর প্রকাশিত হয়: ‘চট্টগ্রামের পটিয়া থানার ধলঘাটের শ্রীমতী প্রীতি ওয়াদ্দাদার ৫ জুলাই চট্টগ্রাম শহর হইতে অন্তর্ধান করেছেন; বয়স ১৯ বছর। পুলিশ তাঁহার সন্ধানে ব্যস্ত।’

‘ইউরোপীয়ান ক্লাব’ নামে ব্রিটিশ প্রমোদকেন্দ্র ক্লাবটিতে ১৯৩২ সালের ১০ আগস্ট শৈলেশ্বর চক্রবর্তীর নেতৃত্বে প্রথম আক্রমণ ব্যর্থ হয়। এরপর মাস্টারদা ২৩ সেপ্টেম্বর নারী বিপ্লবী প্রীতিলতার নেতৃত্বে আক্রমণের নির্দেশ দেন। প্রীতিলতা ধুতি-পাঞ্জাবী, সাদা পাগড়ি ও রবার জুতা পরে, ক্লাবের পাশ দিয়ে পাঞ্জাবী ছেলেদের কোয়ার্টার অতিক্রম করে প্রথমে আক্রমণ শুরু করেন। বাঁ-পাশে গুলির আঘাত পেয়েও দলের সঙ্গে এগিয়ে যান তিনি।

পাহাড়তলী ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণের পর প্রীতিলতা পূর্ব সিদ্ধান্ত মতো মুখে পটাসিয়াম সায়ানাইড পূর্ণ করেন। বিপ্লবীরা তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে দ্রুত স্থান ত্যাগ করেন। পরদিন পুলিশ ক্লাব থেকে ১০০ গজ দূরে প্রীতিলতার মরদেহ পাওয়া যায়। মরদেহ তল্লাশি করে লিফলেট, অপারেশন পরিকল্পনা, রিভলবারের গুলি, রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের ছবি ও হুইসেল পাওয়া যায়। ময়নাতদন্তে নিশ্চিত হয়, গুলির আঘাত গুরুতর নয়—মৃত্যুর কারণ পটাসিয়াম সায়ানাইড।

আরও পড়ুন

রিলেটেড পোস্ট