শনিবার, ০৭ মার্চ, ২০২৬

বাংলাদেশের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের সূচনা করেছিলেন বেগম জিয়া

নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশের রাজনৈতিক আকাশে এক মহাতারকার পতন হলো। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ক্যানভাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল চরিত্র ছিলেন খালেদা জিয়া। বিএনপির চেয়ারপারসন ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী গতকাল রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেছেন। তার প্রয়াণ শোক বিহ্বল করেছে তার দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মী থেকে আপামর জনসাধারণকে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় তিনি দল-মতের ঊর্ধ্বে এসে রাষ্ট্রনায়ক এবং সবার নেত্রী হয়ে উঠেছিলেন। বিদেশী আধিপত্য ও দেশীয় গোষ্ঠীস্বার্থের বিরুদ্ধে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ ও গণমানুষের স্বার্থ সুরক্ষার অতন্দ্র প্রহরী ছিলেন তিনি। বাংলাদেশপন্থী রাজনীতির আইকনে পরিণত হয়েছিলেন তুমুল জনপ্রিয় এ নেত্রী। জীবনের কোনো নির্বাচনে পরাজিত হননি। এমনকি পাঁচটি আসনে নির্বাচনে অংশ নিয়েও বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন। উদার বাজার ব্যবস্থায় প্রবেশ, ব্যক্তি খাতের বিকাশ, রফতানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠা, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) প্রবর্তন, কৃষিতে বিপ্লব, নারী শিক্ষা বিস্তার ও শিক্ষার আধুনিকায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন তিনি।

স্বৈরশাসন, রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন, একের পর এক মামলা ও দীর্ঘ কারাবরণের মধ্যেও তিনি কখনো জনগণের অধিকার প্রশ্নে নতিস্বীকার করেননি। ক্ষমতার মোহ নয়, বরং গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠাই ছিল তার রাজনীতির মূল দর্শন। দেশ ও দলের স্বার্থে কারাবরণকে তিনি কোনো দুর্বলতা নয়, বরং আন্দোলনেরই একটি অংশ হিসেবে গ্রহণ করেছেন। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকা সত্ত্বেও গণতান্ত্রিক সংগ্রামের প্রশ্নে তার অবস্থান কখনো শিথিল হয়নি। তিনি কেবল একটি রাজনৈতিক দলের চেয়ারপারসন ছিলেন না; তিনি হয়ে উঠেছিলেন গণতন্ত্রকামী মানুষের প্রতীক। তার নেতৃত্বে রাজপথে গড়ে ওঠা আন্দোলন নিপীড়িত জনগণের মাঝে আজও সাহস ও প্রত্যয়ের সঞ্চার করে। চব্বিশের অভ্যুত্থানের ছাত্র নেতৃত্বও তার জীবন সংগ্রাম থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েছে এবং তাকে রাজনৈতিক অভিভাবকের জায়গায় বসিয়েছে। গণতন্ত্র যখন বারবার নির্বাসিত হয়েছে, রাষ্ট্রযন্ত্র যখন ভিন্নমত দমনে ব্যবহৃত হয়েছে, তখনো তিনি অন্যায়ের সঙ্গে সমঝোতার পথ বেছে নেননি। কারাবরণ, মিথ্যা মামলা কিংবা চিকিৎসা বঞ্চনা—সব প্রতিকূলতার মধ্যেও জনগণের ভোটাধিকার ও বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রশ্নে তিনি ছিলেন অবিচল। খালেদা জিয়া কখনো সুবিধার রাজনীতি কিংবা আপসের পথ গ্রহণ করেননি। সম্ভবত তিনি বিশ্বাস করতেন, অন্যায়ের সঙ্গে আপস করলে ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। তাই তিনি লাখো গণতন্ত্রকামী মানুষের আশা, আস্থা ও প্রেরণার নাম হয়ে উঠেছিলেন। তার আপসহীন নেতৃত্ব রাজনীতিতে একটি স্পষ্ট বার্তা রেখে গেছে—নীতি ও আদর্শের প্রশ্নে দৃঢ় থাকাই প্রকৃত রাষ্ট্রনায়কের পরিচয়।

বেগম জিয়ার এ প্রস্থানের মধ্য দিয়ে অবসান হলো বাংলাদেশের রাজনীতিতে চার দশকেরও বেশি সময়জুড়ে বিস্তৃত এক সংগ্রামমুখর অধ্যায়ের। ১৯৮১ সালে স্বামী প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আকস্মিক হত্যাকাণ্ডের পর এক গভীর জাতীয় সংকটের সময়ে তিনি রাজনীতিতে পা রাখেন। ঘরোয়া জীবনের নিভৃত পরিসর ছেড়ে রাজপথে নামার সেই সিদ্ধান্ত ছিল সময়ের দাবিতে নেয়া এক কঠিন ও সাহসী পদক্ষেপ। তখন তার কাঁধে এসে পড়ে নেতৃত্বহীন ও বিপর্যস্ত একটি দলকে পুনর্গঠনের গুরুদায়িত্ব। সেই সংকটকালীন সূচনা থেকেই শুরু হয় তার দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিযাত্রা, যা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের ইতিহাসে এক স্বতন্ত্র অধ্যায় হয়ে ওঠে। ধারাবাহিক দমন-পীড়ন, কারাবরণ ও রাজনৈতিক বৈরিতার মধ্যেও তিনি আপসের পথ বেছে নেননি।

দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় তিনি কখনো ক্ষমতার শীর্ষে আরোহণ করেছেন, আবার কখনো কারাবরণ ও চরম ব্যক্তিগত ত্যাগের মধ্য দিয়ে তার জীবন অতিবাহিত করেছেন। কিন্তু প্রতিকূল সময়েও তার মাথানত না করার তেজস্বী মানসিকতা তাকে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে এক বিশেষ আসনে বসিয়েছিল। ৯১-এর সংসদীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পর্যন্ত—বাংলাদেশের প্রতিটি রাজনৈতিক আন্দোলনে তার নাম মিশে আছে। বয়সের ভার ও নানা শারীরিক জটিলতা তাকে দুর্বল করলেও আদর্শ ও রাজনৈতিক সাহস ছিল অটল। গতকাল তার এ বিদায় কেবল একটি রাজনৈতিক দলের ক্ষতি নয়, বরং বাংলাদেশের এক ঐতিহাসিক যুগের পরিসমাপ্তি। ইতিহাসে তিনি অমর হয়ে থাকবেন এমন এক নেত্রী হিসেবে, যিনি জাতীয় নির্বাচনে কোনোদিন পরাজিত হননি এবং জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নিজ আদর্শে অটল ছিলেন।

খালেদা জিয়া যখন বিএনপির নেতৃত্বে আসেন, তখন জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসন চলছিল। সেই শাসনের বিরুদ্ধে নয় বছরের আন্দোলনের মধ্য দিয়েই তিনি রাজনীতিতে নিজের এবং দলের অবস্থান তৈরি করেন বলে বিএনপি নেতারা মনে করেন। ১৯৮৩ সালে তিনি সাতদলীয় ঐক্যজোট গঠন করে এরশাদের শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেছিলেন। অন্যদিকে আন্দোলন করে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আটদলীয় জোট এবং বামপন্থী দলগুলোর পাঁচদলীয় জোট। ১৯৮৬ সালে আওয়ামী লীগের জোট এরশাদ সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। তবে বিএনপির জোট নির্বাচনে অংশ না নিয়ে রাজপথের আন্দোলনে থাকায় খালেদা জিয়া আপসহীন নেত্রী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন। সরকারবিরোধী আন্দোলনে খালেদা জিয়া গ্রেফতার হয়েছিলেন তিনবার। এরশাদ সরকারের পতনের পর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচনের মাধ্যমে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি ক্ষমতায় আসে। তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হয়ে ইতিহাস গড়েন। নির্বাচনে খালেদা জিয়া পাঁচটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সবক’টি আসনেই নির্বাচিত হয়েছিলেন।

সেই নির্বাচনের আগে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে থাকা তিন জোটের রূপরেখায় সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার অঙ্গীকার ছিল। সেই প্রেক্ষাপটে নির্বাচনের পর গঠিত পঞ্চম সংসদে সংসদ নেতা হিসেবে খালেদা জিয়া রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা পাল্টিয়ে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার প্রবর্তনের জন্য বিল উত্থাপন করেছিলেন এবং ঐকমত্যের ভিত্তিতে তা পাস হয়। তখন দীর্ঘ ১৬ বছর পর ফিরে আসে সংসদীয় সরকার।

এরশাদের শাসনামল ছাড়াও খালেদা জিয়া জেলে গিয়েছিলেন ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে খালেদা জিয়া জেলে গিয়েছিলেন ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি। তবে দুই বছরের বেশি সময় জেল খেটে অসুস্থতার কারণে আওয়ামী লীগ সরকারের নির্বাহী আদেশে বিভিন্ন শর্তে মুক্তির পর নিজ বাসায় ওঠেন। পরবর্তী সময়ে কয়েক দফায় তার সেই মুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়েছে। এরপর খালেদা জিয়া দৃশ্যমান কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেননি। গত বছর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্টেই নির্বাহী আদেশে মুক্তি পান খালেদা জিয়া। এরপর তাকে সীমিত পরিসরে দলের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং রাষ্ট্রীয় ও কূটনৈতিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে দেখা গেছে।

নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে খালেদা জিয়া সরকারের সিদ্ধান্তগুলো ছিল বৈপ্লবিক। নারীদের শিক্ষাগ্রহণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় ছাত্রীদের জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা করা হয় এবং ছাত্রীদের দশম শ্রেণী পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা নিশ্চিত করা হয়। এছাড়া সরকার শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি চালু করে। ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়া যখন দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন তখন দেশের স্কুলগুলোয় ছাত্রছাত্রীদের অনুপাত ছিল ৫৫:৪৫, তিনি যখন ১৯৯৬ সালে মেয়াদ শেষ করেন তখন এ অনুপাত দাঁড়ায় ৫২:৪৮।

খালেদা জিয়ার প্রয়াণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক দীর্ঘ ও তাৎপর্যপূর্ণ যুগের পরিসমাপ্তি ঘটল। গৃহবধূর শান্ত, নিরিবিলি জীবন থেকে সময়ের প্রয়োজনে তিনি উঠে এসেছিলেন রাজপথের নেতৃত্বে—পরিণত হয়েছিলেন দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও শক্তিশালী এক রাজনৈতিক প্রতীকে। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক পর্ব পর্যন্ত তার ভূমিকা বাংলাদেশের ইতিহাসে অমলিন হয়ে থাকবে। রাজনৈতিক উত্থান-পতন, দীর্ঘ কারাবরণ কিংবা একের পর এক ব্যক্তিগত শোক—কোনো কিছুই তাকে তার নীতি ও আদর্শের পথ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। মৃত্যুর মাধ্যমে তার শারীরিক উপস্থিতির অবসান ঘটলেও বাংলাদেশের রাজনীতিতে তার ত্যাগ, সংগ্রাম এবং ‘আপসহীন’ নেতৃত্ব দীর্ঘদিন প্রাসঙ্গিক হয়ে থাকবে। তিনি চলে গেছেন, কিন্তু রেখে গেছেন এক বর্ণাঢ্য, সংগ্রামমুখর ও স্থায়ী রাজনৈতিক ইতিহাস; যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

আরও পড়ুন

রিলেটেড পোস্ট